ভ্যাটে দুই স্তরের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার

পণ্যভেদে ৪ থেকে ১৫ শতাংশ হারে পাঁচ স্তরে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট আদায় করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। ট্যারিফের ভিত্তিতে দেড় শতাংশ পর্যন্ত ভ্যাটও রয়েছে অনেক পণ্য ও সেবায়। তবে আগামী অর্থবছর থেকে ভ্যাটের স্তর দুটিতে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করছে সরকার। যদিও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন সম্ভব হবে কিনা সে ব্যাপারে সন্দিহান রাজস্ব আহরণকারী সংস্থাটি।

ভ্যাটের একক হার ১৫ শতাংশ ধরে ভ্যাট আইন ২০১২ চলতি অর্থবছর থেকেই কার্যকর করার কথা ছিল। শেষ মুহূর্তে এসে নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন ২০১৯ সাল পর্যন্ত স্থগিত করা হয়। কিন্তু ভ্যাটের একক হারের সঙ্গে মানুষকে অভ্যস্ত করতে আগামী অর্থবছর থেকেই দুই স্তরে ভ্যাট আদায়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে এনবিআরকে নির্দেশনা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।

সম্প্রতি এনবিআরে পাঠানো নির্দেশনায় অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, এখন বিভিন্ন স্তরে ৪, ৫, ৭.৫, ১০ ও ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট রয়েছে। এগুলো অন্তত দুই ভাগে ভাগ করা যায়। কী হারে কী পণ্য ভ্যাট দেয়, আর কত দেয় তার তালিকা দরকার। আগামীতে ভ্যাটের হার হবে দুই স্তরের। ১৫ শতাংশ হারে একটা স্তর তো থাকবেই। অন্য স্তরটা কী হবে, তা ঠিক করতে হবে।

অর্থমন্ত্রীর এ নির্দেশনার আলোকে দুই স্তরে ভ্যাট আদায়ের প্রভাব কী হতে পারে, তা পর্যালোচনায় এরই মধ্যে কাজ শুরু করেছে এনবিআর। আগামী বাজেটেই দুই স্তরের ভ্যাট বাস্তবায়ন হলে ভোক্তা ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে কী প্রভাব পড়বে, তা বিশ্লেষণ ছাড়া এটা বাস্তবায়ন সম্ভব কিনা, তা নিয়ে সন্দিহান তারা। ফলে শেষ পর্যন্ত ভ্যাট কাঠামোতে এবারো বড় পরিবর্তন আনা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।

এনবিআরের এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, আমাদের মূল লক্ষ্য আগামী বাজেট থেকেই ভ্যাটের সব কার্যক্রম অনলাইনের মাধ্যমে সম্পন্ন করা। দুই স্তরে ভ্যাট আদায় আমাদের লক্ষ্য নয়। পুরনো আইনের বহুস্তর ভ্যাট কাঠামো সামনে রেখেই অনলাইন প্রযুক্তিটি আপগ্রেড করা হয়েছে। এখন পর্যস্ত ১ লাখ ২০ হাজার ১৯৫টি প্রতিষ্ঠান অনলাইন নিবন্ধন নিয়েছে। এর মধ্যে ভ্যাট নিবন্ধন নিয়েছে ১ লাখ ৮ হাজার ৪৭৪টি প্রতিষ্ঠান ও টার্নওভারের আওতায় তালিকাভুক্ত হয়েছে ১১ হাজার ৭২১টি প্রতিষ্ঠান।

দুই স্তরে ভ্যাট আদায়ে আপত্তি আছে ব্যবসায়ীদেরও। হঠাৎ দুই স্তরে ভ্যাট নির্ধারণ করা হলে তাতে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হবে বলে মনে করেন তারা।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, বর্তমানে ৪ থেকে শুরু করে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত ভ্যাটের কয়েকটি স্তর রয়েছে। একেক পণ্যে একেক হারে ভ্যাট দিতে হয়। নতুন আইন অনুযায়ী ভ্যাটের হার ও পদ্ধতি নির্ধারণে ব্যবসায়ী এবং এনবিআর কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি কমিটি করা আছে। এ নিয়ে আমরা কাজও করছি। এর মধ্যে আগামী বাজেটে দুই স্তরে ভ্যাটের ঘোষণা এলে ব্যবসায়ীরা তা কোনোভাবেই মেনে নেবেন না। এটা যুক্তিসঙ্গতও হবে না। আইন প্রণয়নের আগে অবশ্যই তার প্রভাব পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

বর্তমানে সাধারণ পণ্য ও সেবায় ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট দিতে হয় উৎপাদক, আমদানিকারক ও সেবাগ্রহীতাকে। এর বাইরে বিভিন্ন স্তরে এসিবিহীন রেস্তোরাঁয় সাড়ে ৭ শতাংশ, নির্মাণকাজে ৬, জমি বিক্রয়ে ৩, আকারভেদে ফ্ল্যাটের ওপর দেড় থেকে সাড়ে ৪, আসবাব উৎপাদন পর্যায়ে ৪ ও বিপণন পর্যায়ে ৬, জুলেয়ারিতে ৫, জোগানদার সেবায় ৫, পেট্রোলিয়াম পরিবহনে সাড়ে ৪ ও অন্য পণ্য পরিবহনে ১০ শতাংশ হারে ভ্যাট আদায় করা হয়। এছাড়া বিদ্যুৎ বিলের ওপর ৫, ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের ওপর সাড়ে ৭, ব্র্যান্ডের পোশাক ও সুপারমার্কেটের বিক্রির ওপর ৪ ও তথ্যপ্রযুক্তি সেবার বিপরীতে সাড়ে ৪ শতাংশ সংকুচিত হারে ভ্যাট আরোপ আছে। একে দুটি স্তরে আনতে গেলে নতুন করে বাজার প্রভাব বিশ্লেষণ করতে হবে এনবিআরকে।

আগামী বাজেটে ভ্যাট আইনে পরিবর্তনের বিষয়ে এনবিআর জানিয়েছে, ২০১৯ সালের ১ জুলাই নতুন ভ্যাট আইন কার্যকর হবে। পূর্বপ্রস্তুতির অংশ হিসেবেই আসন্ন বাজেটে অনলাইন ব্যবস্থা প্রচলনে বিধিমালা সংশোধন ও ভ্যাটের দুটি স্তর করতে চাইছে সরকার। পাশাপাশি ভ্যাট আদায় কার্যক্রম গতিশীল করতে আসন্ন বাজেটে ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস (ইএফডি) চালু ও তা অনলাইন সিস্টেমের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত করা হচ্ছে। এটি হলে কর্মকর্তারা অফিসে বসেই ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে কেনাবেচা পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন। এজন্য বাজেটে ইসিআরের বিধিমালা সংশোধন করে ইএফডি ফিচার যুক্ত করা হচ্ছে। বাজেটে এ ধরনের তিন-চারটি বিষয়ের ওপর অর্থমন্ত্রী সুস্পষ্ট বক্তব্য দিতে পারেন। এসব পরিবর্তনের ওপর ভর করেই ভ্যাট আদায়ের বড় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

আগামী অর্থবছরের জন্য চলতি অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা থেকে ৩২ দশমিক ৪৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকার ভ্যাট

আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়; যা এনবিআরের মোট রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার ৩৭ শতাংশ।

১৫ শতাংশ একক হারে ভ্যাট আদায়ের পরিকল্পনা থেকে চলতি অর্থবছরও ভ্যাট বাবদ বড় রাজস্বের লক্ষ্য ধরা হয়। আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে ভ্যাট বাবদ রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯১ হাজার ৩৪৪ কোটি টাকা। শেষ মুহূর্তে ভ্যাট আইন দুই বছরের জন্য স্থগিত করায় বছরের প্রথম নয় মাসে এ খাতে ৯ হাজার ৩৯৪ কোটি টাকা ঘাটতি দেখা গেছে। ফলে লক্ষ্যমাত্রা সংশোধন করে ৮৩ হাজার কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে।

spot_img
পূর্ববর্তী নিবন্ধঅফিস শুরু-ছুটির সময় সিনিয়র পুলিশদের রাস্তায় থাকার নির্দেশ
পরবর্তী নিবন্ধনিরাশায় আমেরিকা , আশাবাদী চীন

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে