রাজধানীর হাতিরঝিল থানা পুলিশের হেফাজতে থাকা এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। সুমন শেখ ওরফে রুমন (২৬) নামে ওই যুবককে চুরির মামলায় গ্রেফতার করে থানার হাজতখানায় রেখেছিল পুলিশ। শনিবার সেখান থেকে তার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। স্বজনদের অভিযোগ তাকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে।
রুমনের মৃত্যুর ঘটনায় তার স্বজন ও এলাকাবাসী শনিবার বিকালে হাতিরঝিল থানার সামনে বিক্ষোভ করেন। পুলিশ বলছে, রুমন হাজতখানার লোহার গ্রিলের সঙ্গে গলায় পরনের প্যান্ট পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। সিসি ক্যামেরার ফুটেজে আত্মহননের দৃশ্য স্পষ্ট। এদিকে দায়িত্বে গাফিলতির অভিযোগে থানার ডিউটি অফিসার এসআই হেমায়েত উদ্দিন ও সেন্টি কনস্টেবল জাকারিয়াকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। ঘটনার তদন্তে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
সুমনের স্ত্রী জান্নাত আরা জানান, রামপুরা টিভি সেন্টারের পাশে মাসুদ অ্যান্ড ব্রাদার্স নামে পিওরইট-এর একটি ডিস্টিবিউটর প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন সুমন। সেখানে চুরির অভিযোগে শুক্রবার গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে রাতে পুলিশ তাকে থানায় আনার সময় মারধর করেছে। এরপর থানা হাজতে নির্যাতনের সময় সুমনের মৃত্যু হয়। তার বাড়ি নবাবগঞ্জ থানার দক্ষিণকান্দি। জান্নাত বলেন, ‘আমার স্বামীরে ওরা থানার ভেতর মেরে ফেলছে। অফিসে ওরে মারছে। রাতে পুলিশ গিয়ে নিয়ে আসছে। পুলিশও মারতে মারতে আনছে। রাতে আমি থানায় দেখতে আসছিলাম, আমারে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করে বের করে দিছে।’ পুলিশ হেফাজতে সুমনের মৃত্যু নিয়ে হাতিরঝিল থানার সামনে জান্নাতসহ স্বজনরা বিক্ষোভ করেন। এর ফলে বিকাল ৫টা থেকে হাতিরঝিল থানার সামনের সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পুলিশ কয়েক দফায় বিক্ষুব্ধদের সরানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। স্থানীয় ছাত্রলীগ, যুবলীগের কর্মী পরিচয়ে বেশ কয়েকজন যুবক বিক্ষোভকারীদের থানার সামনে থেকে সরে যেতে বলেন। রাত ৮টার দিকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।
সুমন শেখের মৃত্যুর বিষয়ে তার স্বজন মো. সোহেল আহমেদ বলেন, শুক্রবার দুপুরে একটি চুরির মামলায় সুমন শেখকে গ্রেফতার করে পুলিশ। সুমন রামপুরায় পরিবারের সঙ্গে বসবাস করে। আজ আমরা জানতে পারি সে থানার ভেতরে মারা গেছে। তিনি বলেন, সুমন থানায় আত্মহত্যা করেছে-এমন সিসিটিভি ফুটেজ পুলিশ আমাদের দেখিয়েছে। সেখানে দেখা যায়, রাত সাড়ে ৩টায় সুমন তার পরনের ট্রাউজার দিয়ে থানার গ্রিলের সঙ্গে ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করছে। আমাদের প্রশ্ন, থানায় পুলিশের হেফাজতে একজন লোক কীভাবে আত্মহত্যা করে, পুলিশ তখন কী করছিল? স্বজনদের অভিযোগ, পুলিশের দায়িত্ব অবহেলার কারণে রুমনের মৃত্যু হয়েছে। যথাযথ দায়িত্ব পালন করলে তিনি গলায় ফাঁস দেওয়ার সুযোগ পেতেন না কোনোভাবেই।
এটি আত্মহত্যা নয়, পুলিশের অবহেলা ও হত্যা উল্লেখ করে সুমনের শ্যালক সাইফুল বলেন, ‘আমার ভাইকে গত শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে থানার পুলিশ ও তার অফিসের ম্যানেজার অফিসে যাওয়ার কথা বলে নিয়ে আসে। আমরা তখন বলি, আজ শুক্রবার অফিস বন্ধ। কিন্তু তারা শোনে নাই। পরে পুলিশ আমার ভাইকে থানায় এনে আটকে রাখে। আমরা দেখা করতে এলে দেখা করতে দেয়নি। সকালে ভাইয়ের জন্য পরোটা, ডিম, ভাজি কিনে নিয়ে আসি। তখনো আমাদের দেখা করতে দেওয়া হয়নি। দুপুর ১২টার দিকে আমাদের বলা হয়, আদালতে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু আদালতে গিয়ে দেখি বন্ধ।’ সাইফুল বলেন, ‘পরে থানায় যোগাযোগ করা হলে তারা বলে, সুমন অসুস্থ। ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগে আছে। সেখানে গিয়েও দেখি নাই। পরে নানা নাটকীয়তা শেষে বিকাল ৪টার দিকে জানানো হয়, আমার ভাই থানার ভেতরে আত্মহত্যা করেছে। লাশ সোহরাওয়ার্দী মর্গে আছে। ময়নাতদন্ত শেষে এখন মরদেহ বুঝিয়ে দেওয়া নিয়েও নাটক করছে পুলিশ। থানা থেকে বলছে, লাশ রামপুরায় নেওয়া যাবে না। সরাসরি গ্রামে নিয়ে যেতে হবে।’ সাইফুল অভিযোগ করে বলেন, ‘আমার ভাই রাত ৩টা ২৮ মিনিট পর্যন্ত জীবিত ছিল। এরপর কী হয়েছে সে বিষয় কিছু বলছে না পুলিশ। থানা পুলিশ অন্যায়ভাবে নির্যাতন করে ভাইকে মেরেছে। আমার ভাই ওই অফিসে চাকরি ছেড়ে দিতে চাওয়াই কাল হলো! অফিসের লোকজনের সহযোগিতায় পুলিশ এমন কাজ করল। আমার ভাইয়ের কোনো দোষ ছিল না।’ সুমন স্ত্রী জান্নাতকে নিয়ে রামপুরা হাই স্কুল গলিতে একটি ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকতেন। তার বাবা রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন।
পুলিশের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, থানায় যেসব পুলিশ সদস্য ডিউটি করেন, তাদের হাজতখানায় আসামি দেখভাল করার কথা। আসামি ভেতরে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটাচ্ছে কিনা, সেটিও দেখার দায়িত্ব তাদের। এ ব্যাপারে তেজগাঁও বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) আজিমুল হক বলেন, ৩৮৯/বি রামপুরায় অবস্থিত মেসার্স মাসুদ অ্যান্ড ব্রাদার্সের ৫৩ লাখ ৫২ হাজার ৭২০ টাকা চুরি হয়েছে মর্মে হাতিরঝিল থাসায় ১৫ আগস্ট মামলা করেন প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজার মোসলেম উদ্দিন মাসুম। এরপর পুলিশ তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে সুমন শেখকে আটক করে। তার কাছ থেকে ৩ লাখ ১৩ হাজার টাকা জব্দ করা হয়। তাকে হাতিরঝিল থানা হাজতে রাখা হলে রাত তিনটা ৩২ মিনিটের দিকে তিনি নিজের পরনের পেন্ট গ্রিলের সঙ্গে গলায় পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেন। আমরা একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে লাশ ময়নাতদন্তের জন্য সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল মর্গে পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, এ ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে রাতের ডিউটি অফিসার হেমায়েত উদ্দিন ও সেন্টি কনস্টেবল জাকারিয়াকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তিনি বলেন, এ ঘটনায় তেজগাঁও জোনের এডিসিকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেবে।




















