চিকিৎসক সেজে ব্যাংক কর্মকর্তাকে বিয়ে, অন্য নারীদের সঙ্গেও প্রতারণা

লিটন সরকার কুড়িগ্রামের রাজারহাটের ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের (৪ নম্বর ওয়ার্ড) নির্বাচিত সদস্য। এ পরিচয়ের বাইরে তিনি নিজেকে চিকিৎসক জিয়াউল হাসান (জিয়া) নামে পরিচয় দিয়ে একাধিক নারীকে বিয়ে করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক নারীর সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগও উঠেছে। গত ১৪ জুন ‘চিকিৎসক জিয়াউল হাসান’ পরিচয় দিয়ে ঢাকার একজন ব্যাংক কর্মকর্তাকে বিয়ে করেন লিটন। তবে বিয়ের পরদিনই স্ত্রীকে ছেড়ে যান তিনি। এ নিয়ে লিটনের বিষয়ে খটকা লাগে স্ত্রীর। তারপর লিটনের প্রতারণার নানা তথ্য তিনি জানতে পারেন।

লিটনের এই স্ত্রী প্রথম আলোকে বলেন, খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারেন, যে ব্যক্তিকে বিয়ে করেছেন, তিনি ভুয়া চিকিৎসক। নাম, পরিচয় সবই ভুয়া। ব্যাংক কর্মকর্তা এই নারী গত ১৩ আগস্ট রাজধানীর সবুজবাগ থানায় লিটনের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং প্রতারণা ও প্রলোভনের মাধ্যমে সম্মতি নিয়ে ধর্ষণসহ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে মামলা করেছেন।

সম্প্রতি তিনি প্রথম আলো কার্যালয়ে এসে বলেন, লিটন নিজেকে পরিচয় দিয়েছিলেন পাবনার আল-সাফা হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক কমপ্লেক্সের চিকিৎসক জিয়াউল হাসান নামে। বলতেন, তিনি এখানকার মেডিকেল অফিসার হিসেবে কাজ করছেন। বিয়ের আগে তিনি অ্যাপ্রোন গায়ে দিয়ে হাসপাতাল থেকে ভিডিও কলে কথা বলতেন। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, জিয়াউল হাসান (শিপু) নামের এক চিকিৎসকের বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) নিবন্ধন নম্বরসহ বিভিন্ন তথ্য ব্যবহার করে লিটন সেখানে ডাক্তারি করেছেন। তাঁর একাধিক স্ত্রী ও সন্তান রয়েছে। বিভিন্ন নারীর সঙ্গে প্রতারণার তথ্যও বেরিয়ে আসে। এর পরে তিনি মামলা করেছেন।

ব্যাংক কর্মকর্তা এই নারীর গত বছর আগের স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়। তাঁর এক মেয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ছে। সব জেনেই লিটন বিয়ের জন্য রাজি হয়েছিলেন। ঘরোয়া পরিবেশে বিয়ের ভিডিও ফুটেজ ও ছবি আছে। তিনি বলেন, লিটন তাঁকে বলেছিলেন আগের স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদের তিন মাস হয়নি। সে কারণে আপাতত কাজি ডেকে বিয়ে করতে হবে। তিন মাস পার হলে বিয়ে নিবন্ধন করা হবে। সেভাবেই তাঁদের বিয়ে হয়। তখন মনে করেছিলেন চিকিৎসক জিয়াউল হাসানকে বিয়ে করছেন। কিন্তু তাঁর বিয়ে তো হয়েছে লিটনের সঙ্গে।

তবে জিয়াউল হাসান নামধারী লিটন সরকার প্রথম আলোকে বলেছেন, এই নারীকে বিয়েই করেননি তিনি। তাঁর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ ভিত্তিহীন ও ষড়যন্ত্রমূলক বলেও দাবি করেছেন এই ইউপি সদস্য।

এদিকে লিটনের বিরুদ্ধে থানায় দুটি অভিযোগ দায়ের করেছেন আসল চিকিৎসক লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সহকারী সার্জন জিয়াউল হাসান (শিপু) । বিএমডিসিতেও লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন তিনি। এ ছাড়া লিটনের বিরুদ্ধে ভুয়া চিকিৎসক পরিচয়ে প্রতারণার শিকার হওয়ার কথা জানিয়ে কয়েকজন নারী থানায় অভিযোগ করেছেন।

চিকিৎসক না হয়েও জিয়াউল হাসান (জিয়া) নামে একজন প্রতারণার মাধ্যমে সেখানে ডাক্তারি করেছেন বলে স্বীকার করেছেন আল-সাফা হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক কমপ্লেক্সের পরিচালকদের একজন রায়হানুল কবির। তিনি মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, গত ২০ থেকে ২৫ দিন আগে একজন নারী জিয়াউল হাসানের (জিয়া) স্ত্রীর পরিচয় দিয়ে হাসপাতালে খোঁজখবর করতে আসেন। তখনই তাঁর সনদ আরেকজনেরটা কপি করা, আসল চিকিৎসকের চেহারার সঙ্গে তাঁর চেহারার মিল নেই এসব অনিয়ম ধরা পড়ে।

তিনি কীভাবে এখানে চিকিৎসক সেজে রোগীদের সঙ্গে প্রতারণা করে গেলেন, সে প্রশ্নের জবাবে রায়হানুল কবির প্রথম আলোকে বলেন, ‘এই ব্যক্তির পাবনায় থাকা একজন স্ত্রীর নামে হাসপাতালের পার্টনারশিপ থাকায় মালিকপক্ষ হিসেবে তিনি এখানে বসে রোগী দেখতেন। তবে সব জানার পর তাঁকে হাসপাতালে না আসার জন্য বলা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘ডাক্তার না হয়েও এই ব্যক্তি মানুষের শরীর নিয়ে খেলা করছে। আমরাও চাই তিনি যথাযথ শাস্তি পান।’

spot_img
পূর্ববর্তী নিবন্ধদ্রুত টেকসই প্রত্যাবাসনই রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান: পররাষ্ট্রমন্ত্রী
পরবর্তী নিবন্ধনারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে একাধিক পদে চাকরি, আবেদন ফি ১০০

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে