ড. মুহাম্মাদ আকরাম নদভি বর্তমান বিশ্বের একজন প্রখ্যাত মুসলিম স্কলার। ক্যামব্রিজ ইসলামিক কলেজের ডিন, আসসালাম ইন্সটিটিউটের প্রিন্সিপাল এবং মার্কফিল্ড ইন্সটিটিউট অব হায়ার এডুকেশনের অনারারি ভিজিটিং ফেলো।
১৯৮৯ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অক্সফোর্ড সেন্টার ফর ইসলামিক স্টাডিজের রিসার্চ ফেলো ছিলেন। তিনি মুসলিম নারী মুহাদ্দিসদের জীবনী নিয়ে ৪৩ খণ্ডে ‘আল-ওয়াফা বি আসমাইন নিসা’ নামক চরিত-কোষ রচনা করেছেন। যাতে প্রায় দশ হাজার নারী মুহাদ্দিসদের জীবনী স্থান পেয়েছে। এই কাজে তিনি ১৫ বছর ব্যয় করেছেন।
বাংলাদেশ সফরের অংশ হিসেবে গত ২৯ অক্টোবর ২০২২ তিনি ঢাকা বায়তুল মোকাররম ইসলামি মিলনায়তনে পুরুষদের উদ্দেশ্যে উর্দু ভাষায় বক্তব্য রাখেন। আজ ছাপা হচ্ছে তার প্রথম কিস্তি। অনুলিখন ও অনুবাদ করেছেন- মুহিম মাহফুজ।
সকল প্রশংসা আল্লাহ তাআলার জন্য। দরুদ ও সালাম মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সা.), তার পরিবার ও সকল সাহাবির ওপর। আউজু বিল্লাহি মিনাশ শাইতনির রজিম। বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম। ইন্নামা ইয়াখশাল্লাহা মিন ইবাদিহিল উলামা। আল্লাহর বান্দারের মধ্যে আলেমরাই তাকে ভয় করে।
সম্মানিত ওলামায়ে কেরাম ও প্রিয় ছাত্রবৃন্দ, আমার জন্য অত্যন্ত গৌরবের বিষয়, বাংলাদেশের জাতীয় মসজিদ মহিমান্বিত বায়তুল মোকাররমের এ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আপনাদের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পেয়েছি।
আজ থেকে প্রায় ৩৭ বছর আগে ১৯৮৫ সালে আমি এই মসজিদে প্রথমবার আসার সুযোগ পেয়েছিলাম। আমি তখন দারুল উলুম নাদওয়াতুল উলামা থেকে শিক্ষা সমাপ্ত করে শিক্ষকতার প্রথম বছরে পদার্পণ করেছি মাত্র। সে বছর তাবলীগ জামাতের বিশ্ব ইজতেমা উপলক্ষে বাংলাদেশে এসেছিলাম এবং এই মসজিদ পরিদর্শন করেছি। তখন থেকে এই মসজিদ আমার স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে। এতদিন পরে আজ আবার এখানে আসার দ্বিতীয় সুযোগ পেয়েছি। আলহামদুলিল্লাহ।
১৯৯১ সনে আমি যখন অক্সফোর্ডে ছিলাম, সে সময় ‘ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামি জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিকাশ’ বিষয়ক একটি প্রকল্পে কাজ করেছিলাম। ভারত বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে ইসলাম প্রচারে কোন কোন মাদরাসা-মারকাজ-খানকা বিশেষ ভূমিকা রেখেছে, কোন কোন সুফি-দরবেশ দাওয়াত প্রচার করেছেন, চিশতিয়া, কাদেরিয়া, নকশাবন্দিয়া, সোহরাওয়ার্দীয়া, ফেরদাউসিয়া, সাত্তারিয়াসহ ?
কোন কোন সুফি সিলসিলা ইসলাম প্রচার করেছে- এ বিষয়ে আমি প্রায় ২৩ বছর গবেষণা করেছি। সেজন্য আমাকে আরবি উর্দু ও ফার্সি ভাষার বহু বই ও পাণ্ডুলিপি পড়তে হয়েছে। তখন ইসলাম প্রচারে বঙ্গ অঞ্চলের উজ্জ্বল ইতিহাস সম্পর্কে আমি জেনেছি।
কোন কোন বিখ্যাত আলেম বাংলাদেশে আগমন করেছেন, কোন কোন যুগশ্রেষ্ঠ সূফী-দরবেশ বঙ্গ অঞ্চলে ইসলাম প্রচার করেছেন, তাদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস তখন থেকে আমার স্মৃতিতে সংরক্ষিত। হযরত শাহজালাল ইয়েমেনীসহ অন্যান্য মহান মনীষীদের কথা আমি জানি।
ভারত থেকে বহু মানুষ তাদের খানকায় এসে জ্ঞান শিক্ষা করেছে। শাইখ শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামা ঢাকার সোনারগাঁয়ে মাদরাসা স্থাপন করেছিলেন। তিনি ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম মুহাদ্দিস এবং তিনিই সহিহ বুখারী শরীফ সর্বপ্রথম উপমহাদেশে নিয়ে আসেন। আপনাদের বাংলাদেশের এই গৌরবজনক ইতিহাস আমাকে সব সময় উদ্বুদ্ধ করেছে।
ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়ে এখানে বহু আলেম-ওলামার পদচারণা ছিল, সুফি-দরবেশদের প্রতিষ্ঠিত খানকা ছিল। হিন্দুস্তান-পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ইসলামি জ্ঞান অর্জনের জন্য মানুষ এই বঙ্গ অঞ্চলে ছুটে আসতো।
কারণ বঙ্গ অঞ্চলের অতীতের শাসক বা সুলতানগণ ছিলেন অত্যন্ত ক্ষমতাধর এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষক। তারা ইসলাম প্রচারক আলেম-ওলামা ও সুফি-দরবেশদের সম্মান করতেন, সহযোগিতা করতেন, পৃষ্ঠপোষকতা করতেন।
এমনকি এ অঞ্চলের একজন সুলতান পারস্যের মহান কবি সিরাজকে বঙ্গে আগমনের আহ্বান করেছিলেন। মহাকবি সিরাজ সম্পর্কে বলা হয়, ফারসি সাহিত্যে তার চেয়ে বড় কবি আর কেউ ছিল না।
সিরাজের সমকালে বাংলা অঞ্চলে যে শাসক ছিলেন, তিনি চিঠি মারফত মহাকবি সিরাজকে বঙ্গ ভ্রমণের দাওয়াত পেশ করেন। সিরাজ বঙ্গে বা বাংলায় আসতে পারেননি বটে। কিন্তু কবিতায় বাংলার নাম উল্লেখ করে তিনি না আসার কারণ জানিয়ে বলেছিলেন, সিরাজের ফুল-ফলের বাগ-বাগিচাগুলো আমাকে বাংলায় যাবার অনুমতি দিতে চায় না। কবিতায় তিনি বাংলা বা বাঙ্গালা শব্দ ব্যবহার করেন।
এ থেকে আমরা উপলব্ধি করতে পারি, বাংলার শাসকগণ কতটা দানশীল ছিলেন, অতিথিপরায়ন ছিলেন, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্পের প্রতি কেমন আগ্রহী ছিলেন। এ অঞ্চল থেকে পারস্য বা ইরানের সিরাজ বহুদূর। তবু জ্ঞানের প্রতি অদম্য আগ্রহ সিরাজের কবিকে বাংলায় নিয়ে আসার জন্য তাদের উদ্বুদ্ধ করেছে। বাংলাদেশের ইতিহাস অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল এবং সমৃদ্ধ।
এ অঞ্চলে যেমন জ্ঞান ছিল, তেমনি ধন-সম্পদের প্রাচুর্য ছিল। সে কারণে বুখারা-সমরকন্দ-আরব-ইয়েমেনসহ দুরদুরান্ত থেকে মানুষ এখানে ছুটে আসতো। লক্ষ্য করার বিষয়, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলায় কেন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল? কারণ এটা ছিল সে সময়ের সবচেয়ে সম্পদসমৃদ্ধ এলাকা। আল্লাহ তাআলা আপনাদেরকে ঐশ্বর্য ও সমৃদ্ধি দিয়েছেন। এই ভূমিকে, বাংলাদেশের মাটিকে উর্বর বানিয়েছেন।
বাংলাদেশে এসে আমি ভীষণ আনন্দিত হয়েছি। কারণ এ দেশের আলেমসমাজ অত্যন্ত ইতিবাচক পদ্ধতিতে সমাজে কাজ করে যাচ্ছেন। জ্ঞান সাধনায় নিয়োজিত আছেন। আল্লাহ তাআলা মানুষকে বিবেক দিয়েছেন। আর ওলামায়ে কেরামকে বিবেক দিয়ে কাজ করার দায়িত্ব দিয়েছেন।
আলেমদের বৈশিষ্ট্য হলো, তারা তাদের শাগরিদদের তৈরি করবেন, নিজেরা কঠোরতা পরিহার করে চলবেন এবং মানুষের চিন্তা পরিবর্তনের চেষ্টা করবেন। কেননা মানুষের চিন্তা কোন দিকে পরিবর্তিত হয়ে গেলে সে সহজেই সেটা গ্রহণ করতে প্রস্তুত থাকে। তখন আলেমদের শাগরেদরাও তাদের প্রভাবিত করতে পারবে।
যার অন্তরে একবার ঈমানের আগুন জ্বলে উঠেছে, তাকে জ্বলন্ত আগুনে নিক্ষেপ করা হলেও সে ঈমান পরিত্যাগ করবে না। এটাই দাওয়াতের সবচেয়ে বড় শক্তি। আল্লাহ তাআলা এ বৈশিষ্ট্য দিয়েই মানুষ সৃষ্টি করেছেন।
জ্ঞানী ব্যক্তিদের কাজ হল, সাধারণ মানুষের যে কোন প্রশ্নের উত্তরে প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে কোমলতার সঙ্গে জবাব দেওয়া।
মুসলিম ইতিহাসে এমন একটি সময় এসেছিল, যখন চিন্তাগতভাবে মুসলিমরা বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। হাদিস বা সুন্নাহ বিষয়ে মুসলমানদের মধ্যে শৈথিল্য এসে পড়েছিল। তখন মুহাদ্দিসগণ এক অসাধারণ কাজের সূচনা করেছেন। মানুষের মনে হাদিসের গুরুত্ব এবং বড়ত্ব প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছেন। হাদিসের বিরাট বিরাট কিতাব সংকলন করেছেন।
বুখারী, মুসলিম, তিরমিজি, আবু দাউদ, নাসাঈ, ইবনে মাজাহর মত হাজার হাজার হাদিস গ্রন্থ সংকলিত হয়েছে।




















