এরপর কেটে গেছে ৩৬ বছর…আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জেতেনি একবারও!৩৬ বছর মানে তিন যুগ। সময়টা নেহাত কম নয়। এ সময়ে দুনিয়ায় কত কীই-না ঘটে গেছে! ভূরাজনীতি হয়েছে ওলট-পালট। পৃথিবীর নানা প্রান্তে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ বেধেছে, যুদ্ধ থেমে গিয়ে আবার শান্তিও ফিরেছে। প্রযুক্তির কত বাঁকবদল, কত উদ্ভাবন! ৩৬ বছর আগে জন্ম নেওয়া শিশুটি এখন যৌবনের অস্তাচলে। তারুণ্য ছাড়িয়ে গেছে প্রৌঢ়ত্বের সীমা।দুনিয়ার অনেক দেশের কাছে একবার বিশ্বকাপ জয়ই আনন্দের, সীমাহীন গৌরবের। আর্জেন্টিনা সেই বিশ্বকাপই জিতেছে দুবার। ১৯৭৮ সালে প্রথমবারের পর ১৯৮৬ সালে সর্বশেষ। ডিয়েগো ম্যারাডোনার ক্যারিশমায় মেক্সিকোতে ১৯৮৬ বিশ্বকাপ জয়ের পর প্রতিবারই আর্জেন্টিনাকে ব্যর্থ হয়ে ফিরতে হয়েছে। সমর্থকদের হতে হয়েছে আশাহত।আর্জেন্টিনার এই খরা কেন! বেশির ভাগ ফুটবলপ্রেমীই ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করবেন ফুটবলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে। কিন্তু খোদ আর্জেন্টিনার কিছু মানুষই মনে করেন, তাঁদের প্রিয় দল আসলে ‘অভিশাপ’-এর আগুনে পুড়ছে। ৩৬ বছর ধরে বিশ্বকাপ-খরাটা তাঁদের জন্য ভয়ংকর এক ‘অভিশাপ’-এরই পরিণতি।ফুটবল সাময়িকী ফোর ফোর টু থেকে জানা যায়, ১৯৮৬ বিশ্বকাপের আগে কোচ কার্লোস বিলার্দোর আর্জেন্টিনা দল অনুশীলন ক্যাম্প করেছিল দেশটির তিলকারা নামে ছোট্ট শহরে। আর্জেন্টিনার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের আন্দিজ পর্বতের কোলে শুয়ে থাকা শহরটি ছবির মতো সুন্দর। মেক্সিকো সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে অনেক উঁচুতে হওয়ায় অনুশীলনের জন্য তিলকারাকে বেছে নেওয়া হয়েছিল। তিলকারাও সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে বেশ উঁচুতে।সে সময় বিলার্দোর কানে আসে প্রচলিত এক উপকথা। শহরের পুরোনো এক গির্জায় আছে ‘ভার্জিন অব কোপাকাবানা’র মূর্তি। তিলকারার মানুষ অসম্ভব মান্য করে সেই মূর্তিকে। তাদের বিশ্বাস, ‘ভার্জিন অব কোপাকাবানা’র সামনে কেউ যদি মনেপ্রাণে কিছু চায়, সেটি সে পায়। কিন্তু তার একটি শর্ত আছে। মূর্তির সামনে যদি কোনো প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, সেটি অবশ্যই রক্ষা করতে হবে। আর তা না হলেই বিপদ। প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করলে নেমে আসে অভিশাপ, এ বিশ্বাস তিলকারাবাসীর।আর্জেন্টিনা দলও সেই মূর্তি-দর্শনে গিয়েছিল। চেয়েছিল বিশ্বকাপ জেতার আশীর্বাদ। প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, মেক্সিকোতে সফল হলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য তারা আবার ফিরবে কোপাকাবানায়। ১৯৮৬ বিশ্বকাপ আর্জেন্টিনা জিতেছিল ডিয়েগো ম্যারাডোনার জাদুকরি নৈপুণ্যে। কিন্তু তিলকারার ভার্জিন অব কোপাকাবানার কথা তারা ভুলে যায়। আর কোনো দিন সেখানে ফেরা হয়নি আর্জেন্টিনা দলের। শহরের মানুষের বিশ্বাস, এই যে ’৮৬ সালের পর আর্জেন্টিনা আর বিশ্বকাপ জিততে পারেনি, এটা মস্ত বড় এক অভিশাপেরই ফল। প্রতিশ্রুতি পূরণ না করার অমোঘ পরিণতি। যদিও সেই দলের অন্যতম সদস্য হোর্হে বাতিস্তা ২০১১ সালে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, আর্জেন্টিনা দলের ভার্জিন অব কোপাকাবানায় গিয়ে প্রতিশ্রুতি দেওয়ার ঘটনাটি সব জায়গায় একটু বাড়িয়েই বলা হয়েছে।তিলকারার সেই মূর্তির কাছে ক্ষমা চাওয়ার দাবিও উঠেছে বিভিন্ন সময়। কিছুদিন আগে আর্জেন্টিনার এক ম্যাচে সমর্থকেরা একটি প্ল্যাকার্ড নিয়েও হাজির হয়েছিলেন গ্যালারিতে। তাতে লেখা ছিল, ‘দয়া করে তিলকারায় গিয়ে ভার্জিন অব কোপাকাবানায় নিজেদের ভুল স্বীকার করে এসো।’১৯৮৬ সালের পর আর্জেন্টিনা আরও দুবার বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠেও ট্রফি ছুঁয়ে দেখতে পারেনি। ৩৬ বছর পর এবার আবার এসেছে সুযোগটা। ডিয়েগো ম্যারাডোনার জায়গায় আছেন লিওনেল মেসি। তিলকারার ‘অভিশাপ’ বলে কিছু থাকুক আর না থাকুক, এবার আর বিশ্বকাপ থেকে খালি হাতে ফিরতে চায় না আর্জেন্টিনা।মেসিরা অবশ্য আশা করতেই পারেন, তিলকারার ‘অভিশাপ’ থেকে মুক্তি মিলবে তাঁদের। গত নভেম্বরে যে সেই মূর্তির সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন আর্জেন্টাইন ফুটবলের প্রধান ক্লদিও ফাবিয়ান তাপিয়া। ‘অভিশাপ’ বলে যদি কিছু সত্যিই থেকে থাকে, তাপিয়ার প্রার্থনাতে নিশ্চয়ই এখন তা থেকে ‘মুক্ত’ মেসিরা।



















