ফুটবল চলে কাতারে, মানুষ মরে এখানে

সমর্থকেরা অনেক ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করেন, যা বিপদ ডেকে আনতে পারে। লাগামছাড়া বিনোদন অসুস্থতার বহিঃপ্রকাশও বটে।ফুটবল নিয়ে চার বছর পরপর সারা দুনিয়া এককাট্টা হয়ে উৎসবে মাতে। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। সারা বিশ্ব ফুটবল–জ্বরে আক্রান্ত। কার হাতে উঠবে ফিফা বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফি, তা নিয়ে চলছে জল্পনাকল্পনা। তবে আমার কেবলই মনে পড়ছে আবদুল মতিনের কথা। ফেনীর দাগনভূঞার ১ নম্বর সিন্দুরপুর ইউনিয়নের এই বাসিন্দার সঙ্গে ২০১৪ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে দেখা হয়েছিল। আইসিইউতে ছিলেন ২৭ দিন। সাড়ে তিন মাস ধরে তাঁর চিকিৎসা চলেছিল। শেষ পর্যন্ত সংক্রমণ ঠেকানো যায়নি। প্রাণ বাঁচাতে তাঁর হাত-পা কেটে ফেলতে হয়েছে। প্রিয় দল আর্জেন্টিনার পতাকা টাঙাতে নিজের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান লক্ষ্মীপুর আজিম শাহ মার্কেটের তিনতলার ছাদে উঠেছিলেন মতিন। ছাদ ঘেঁষেই চলে গেছে ৩৩ হাজার ভোল্টের বিদ্যুতের তার। পতাকাটি বেঁধেছিলেন একটা লোহার রডে। রডের এক মাথায় বিদ্যুতের লাইন লেগে যায়। ছিটকে পড়ে জ্ঞান হারান তিনি। প্রতি বিশ্বকাপে মতিনের দশা নিয়ে হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে তরুণ–কিশোরেরা আসেন। কেউ বাড়ি ফেরেন পঙ্গু হয়ে। কেউ ফেরেন গোরস্থান বা শ্মশানে।২০১৮ সালে বিশ্বকাপ চলাকালে (সম্ভবত ২১ জুন ২০১৮) ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে গিয়ে দেখা যায়, ওই দিন পর্যন্ত প্রিয় দলের পতাকা টাঙাতে গিয়ে মতিনের মতো বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ভর্তি ছিলেন সাতজন। বিশ্বকাপ ফুটবলকেন্দ্রিক দুর্ঘটনা প্রসঙ্গে আলাপের সময় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের তৎকালীন সমন্বয়কারী ডা. সামন্ত লাল সেন আক্ষেপ করে বলেছিলেন, বিশ্বকাপ ফুটবল ঘিরে উন্মাদনা কার না আছে। কিন্তু সেই উন্মাদনার কারণে যদি জীবন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে, সেই উন্মাদনার দরকার নেই। এ সময় শিশু থেকে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ বার্ন ইউনিটে ভর্তি হয়, তাদের কারও হাত কাটা যায়, কারও পা কাটে পড়ে—এটি কোনো কথা হতে পারে?চলতি বছর ফুটবল উন্মাদনায় পতাকা টাঙাতে গিয়ে ঢাকার কেরানীগঞ্জ, হবিগঞ্জের বানিয়াচং ও ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে অনেকেই বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে দগ্ধ হয়েছেন। চিকিৎসা নিচ্ছেন হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে। সেই সঙ্গে ১২ জনের মৃত্যুর একটা হিসাব দিয়েছে সংবাদমাধ্যম। কাতারে পৃথিবী কাঁপানো ফুটবলের বড় আসর শুরুর পর থেকে আমাদের দেশে এসব অকালমৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। খেলায় অংশগ্রহণকারী দেশগুলোতেও এক মাসে খেলাকে কেন্দ্র করে এত মানুষের মৃত্যুর খবরের কথা শোনা যায় না। এ দেশে আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিলের তরুণ সমর্থকদের মধ্যে এসব মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে বেশি। বেশির ভাগ মৃত্যু হয়েছে পতাকা টাঙাতে গিয়ে। ১২ জনের মধ্যে সাতজন চলে গেছেন পতাকা হাতে। বাকিরা ফুটবল নিয়ে তর্ক-বিতর্কের জের ধরে সংঘর্ষে এবং হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। ঢাকার সাভার, হবিগঞ্জের বাহুবল আর ভোলায় এদের মৃত্যু হয়েছে। খেলা নিয়ে কথা-কাটাকাটি, কাইজা–ফ্যাসাদ আমাদের দেশে প্রায়ই দেখা যায়। ছেলেকে মারার ইরাদা নিয়ে বের হয়ে তাকে না পেয়ে বাবাকে মেরে ফেলে রাখার ঘটনাও ঘটেছে। সারা দেশের ফুটবলপ্রেমীরা দুই প্রধান দলের সমর্থনে ভাগ হয়ে গেছে। শেয়ারের রিকশায় সহযাত্রীর পরিচয় এখন আর্জেন্টিনা না ব্রাজিল। এটা কোনো নতুন বিষয় নয়। একই দল, ক্লাব, হোস্টেল এমনকি পরিবারের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন খেলোয়াড়ের বা ফুটবল দলের সমর্থক আগেও ছিল, এখনো আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে।

spot_img
পূর্ববর্তী নিবন্ধজিদানের গাড়ি দেখে এমবাপ্পে বলেছিলেন, ‘জুতা খুলে উঠব?’
পরবর্তী নিবন্ধএবার অভিনয়ে স্বীকৃতি

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে