ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে ধ্বংসস্তূপে বাকির খাতা খুঁজছেন মাছুম

ব্যবসায়ী মাছুম রানা বঙ্গবাজারের ধ্বংসস্তূপ থেকে কিছু একটা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছিলেন। কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করতেই জানালেন, দোকানের সব পুড়ে গেছে। কিছুই অবশিষ্ট নেই। দোকানের বাকির খাতাটি খুঁজছেন তিনি, যদি পাওয়া যায়। যাঁরা মাছুমের কাছ থেকে বাকিতে মালামাল নিয়েছেন, তাঁদের মুঠোফোন নম্বরসহ বিস্তারিত লেখা ছিল ওই খাতায়। ১০ থেকে ১২ লাখ টাকার মালামাল তিনি বাকিতে দিয়েছিলেন। খাতাটি পেলে হয়তো সেই পাওনা টাকা উদ্ধারের চেষ্টা করতে পারতেন। মাছুম রানা যখন বাকির খাতাটি খুঁজছিলেন, তখন তাঁর হাত ধরেছিল আট বছর বয়সী মাইশা ইসলাম মাহী। ছোট্ট মাইশা বাবার সঙ্গে দোকানে আসার বায়না ধরত প্রায়ই।আজ শুক্রবার সকালেও সে বায়না ধরেছিল বাবার সঙ্গে বের হবে। তাই মেয়েকে নিয়েই সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তিনি বঙ্গবাজারে আসেন। সেখানেই তাঁর সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়।মাছুম রানার ভাষ্য, তাঁর গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার মনোহরগঞ্জের সপুরা গ্রামে। তাঁর বাবা একজন ভূমিহীন কৃষক ছিলেন। পাঁচ ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। দারিদ্র্যের কারণে অষ্টম শ্রেণির পর আর লেখাপড়া করতে পারেননি। জীবিকার তাগিদে এক মামার হাত ধরে ২০০৩ সালে তিনি বঙ্গবাজারে কাপড়ের দোকানে কাজ নেন। ১০ বছর তিনি বঙ্গবাজারে দোকানকর্মীর কাজ করেছেন। ২০১৩ সালে তিনি একটি দোকান ভাড়া নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন।বঙ্গবাজারে চারটি দোকানে তাঁর বিনিয়োগ ছিল প্রায় এক কোটি টাকা। তাঁর সব কটি দোকানই মাছুম নিউ কালেকশন নামে।মাছুম রানা বলেন, ‘অনেক কষ্ট করে এ পর্যন্ত এসেছি ভাই। মাত্রই সুখের মুখ দেখতে শুরু করেছিলাম। পুরো সংসারের ভার আমার ওপর। দুই ভাই আমার সঙ্গেই কাজ করত। তিন মাস আগে ছোট বোনকে বিয়ে দিয়েছি। এখন কী করব, কিছুই বুঝতে পারছি না। এর মধ্যে একটি বেসরকারি ব্যাংক থেকে ৪০ লাখ টাকা ঋণও আছে। সামনে শুধু অন্ধকার দেখছি।’বঙ্গবাজারের ধ্বংসস্তূপের পাশে বিলাপ করছিলেন মো. হোসেন নামের এক ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, তাঁর বাসা ধানমন্ডিতে। ঘটনার পর আর বাসায় যাননি।হোসেন বলেন, ‘সব শেষ হয়ে গেছে। বাসায় গিয়ে কী হবে। সামনে ঈদ, কীভাবে কী করব, কিছুই বুঝতে পারছি না। দোকানে প্রায় ১৫ লাখ টাকার মালামাল ছিল। ঈদ উপলক্ষে আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা ধার করে দোকানে মালামাল তুলেছিলাম। সব পুড়ে গেছে।’গত মঙ্গলবার সকালে বঙ্গবাজার কমপ্লেক্সে আগুন লাগে। সেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের কয়েকটি বিপণিবিতানে। সাড়ে ছয় ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে ফায়ার সার্ভিস আগুন নিয়ন্ত্রণে আনলেও বুধবার অ্যানেক্সকো টাওয়ারে থেমে থেমে ধোঁয়া ও আগুন জ্বলে। গতকাল বৃহস্পতিবার বঙ্গবাজার কমপ্লেক্সের কিছু জায়গা থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখা যায়। আজ শুক্রবার সকালে আগুন পুরোপুরি নেভানো সম্ভব হয় বলে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে জানানো হয়।আজ সকালে বঙ্গবাজারে গিয়ে দেখা যায়, পুরো বঙ্গবাজার যেন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। সেখানে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে। ঘটনাস্থলের আশপাশ এলাকায় ব্যবসায়ীরা বিলাপ করছিলেন। তাঁদের দাবি, ধ্বংসস্তূপ থেকে মালামাল সরিয়ে নেওয়ার পর ব্যবসায়ীদের যেন সেখানে অস্থায়ীভাবে ব্যবসা করার অনুমতি দেওয়া হয়। কারণ, সবচেয়ে বেশি বেচাকেনা হয় ঈদুল ফিতরের সময়।ঈদের আগে পুড়ে যাওয়া বঙ্গবাজারের ব্যবসায়ীরা যেন সাময়িকভাবে ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারেন, সে জন্য ব্যবস্থা করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে বঙ্গবাজার পরিদর্শনের পর সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন।

spot_img
পূর্ববর্তী নিবন্ধবাক্সে ছিল লাখ লাখ টাকা, পুড়ে সব ছাই
পরবর্তী নিবন্ধরাজশাহীতে বিদ্যানন্দের ১ টাকার ইফতার সাড়া ফেলেছে

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে