বহুল আলোচিত শিক্ষা আইনের খসড়া চূড়ান্ত করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। প্রস্তাবিত আইনের খসড়ায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত সময়ের বাইরে শিক্ষকদের কোচিং ও প্রাইভেট পড়ানোর সুযোগ রাখা হয়েছে।
তবে, কোনো শিক্ষক তাঁর নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট পড়াতে পারবেন না। এটি নজরদারি করা কঠিন হবে বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদেরা। এতে একমত জানিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, নোট গাইড বইকে বৈধতা দেওয়ার কোন সুযোগ নেই।
এক দশকের বেশী সময়ের আলোচনা শেষে শিক্ষা আইন আলোর মুখ দেখার অপেক্ষায়। এরই মধ্যে আইনের খসড়া পাঠানো হয়েছে মন্ত্রিপরিষদে। এরপরই তা সংসদে উত্থাপিত হবে।
কি থাকছে খসড়া আইনে? জানা গেছে, মোট ২৮ পৃষ্ঠার ৫৭টি ধারার প্রস্তাবিত আইনে চার স্তরের শিক্ষা ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে।
সব শিশুর জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক এবং প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিকে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য সরকার পর্যায়ক্রমে নিজ মাতৃভাষায় শিক্ষা দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
আইনে বলা হচ্ছে মাধ্যমিক শিক্ষার ধারা হবে তিনটি- সাধারণ, মাদ্রাসা ও করিগরি। প্রাথমিক ও অষ্টম শ্রেণীর সমাপনী পরীক্ষা সম্পর্কে কিছু বলা হয়নি প্রস্তাবিত আইনে।
নতুন আইন কার্যকর হলে ইংরেজি মাধ্যম বা বিদেশি পাঠ্যক্রমের শিক্ষার্থীদের বাংলাদেশের জন্ম, বাংলা, বাংলাদেশ স্টাডিজ এবং সরকার কর্তৃক নির্ধারিত বিষয় বাধ্যতামূলকভাবে পড়তে হবে।
প্রস্তাবিত আইনে ভিন্ন আঙ্গিকে থাকছে কোচিং ও প্রাইভেট পড়ানোর সুযোগ। প্রস্তাব অনুযায়ী, নিজের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীকে পড়াতে পারবেন না, পড়াতে হবে অন্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীকে।
খসড়া অনুযায়ী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট টিউশনের মাধ্যমে পাঠদানে কোচিং সেন্টার পরিচালনা করা বা কোচিং সেন্টারে শিক্ষকতা করা নিষিদ্ধ বলে গণ্য হবে না।
তবে কোচিং সেন্টারে কোনো শিক্ষক তাঁর নিজ প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীকে পাঠদান করাতে পারবেন না।
এমনকি কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষক নিজ প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীকে প্রাইভেটও পড়াতে পারবেন না। কোচিং চালাতে গেলে নিবন্ধন নিতে হবে।
তবে সরকার নির্ধারিত অর্থের বিনিময়ে ও অভিভাবকদের সম্মতিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শ্রেণি কার্যক্রমের বাইরের সময় অতিরিক্ত ক্লাসের ব্যবস্থা করা যাবে।
তবে শিক্ষাবিদেরা মনে করছেন, এটি বাস্তবায়ন করা দুরূহ হবে। কারণ, সারা দেশে অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান; সেখানে কে কাকে পড়াচ্ছেন সেটি দেখবেন কে?
জবাবে শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি বলেন, সব শিক্ষার্থীর অভিভাবকদের পক্ষেও পড়াশোনার বিষয়ে সন্তানকে প্রয়োজনীয় সময় দেওয়া সম্ভব হয় না।
তিনি আরও বলেন, এক্ষেত্রে তারা কোচিং-প্রাইভেটে পড়তেই পারে। কিন্তু সমস্যা হলো, অনেক শিক্ষক ক্লাসে ঠিকমতো না পড়িয়ে তাদের কাছে শিক্ষার্থীদের পড়তে বাধ্য করেন, সেটি অনৈতিক। এটিকেই আমরা বন্ধ করতে চাই।
প্রস্তাবিত আইনের খসড়ায় নোট–গাইড বই মুদ্রণ, বাঁধাই, প্রকাশ বা বাজারজাত নিষিদ্ধ রাখা হয়েছে। কেউ এই বিধান লঙ্ঘন করলে জেল–জরিমানা ভোগ করতে হবে।
১৯৮০ সালে করা একটি আইনেও অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত নোট-গাইড নিষিদ্ধই আছে। এ জন্য এখন নোট-গাইডের পরিবর্তে অনুশীলন বই বা সহায়ক পাঠ্যবই চলছে।
প্রস্তাবিত আইনেও সরকারের অনুমোদন নিয়ে সহায়ক বই বাঁধাই, প্রকাশ বা বাজারজাত করার সুযোগ রাখা হয়েছে।
তবে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা কোনো শিক্ষক শিক্ষার্থীদের সহায়ক বই কেনা বা পাঠে বাধ্য করতে পারবে না। বই কিনতে বা পাঠে বাধ্য বা উৎসাহ দিলে তা অসদাচরণ বলে গণ্য হবে।
এ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, সহায়ক বই থাকতেই পারে। তবে এখন দেখা যায়, যারা এসব সহায়ক বই ছাপে, তারা অনৈতিকভাবে কিছু শিক্ষককে কমিশন দিয়ে ওই প্রকাশনীর বই কিনতে শিক্ষার্থীদের বাধ্য করে।
এ জন্য আইনের খসড়ায় সহায়ক বই থাকলেও এসব অনৈতিক কাজ যাতে না হয়, সেটি বন্ধের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়িত হলে কোচিং–প্রাইভেটের প্রয়োজন হবে না বলে মনে করেন শিক্ষামন্ত্রী।




















