পুরান ঢাকার চকবাজার এলাকার চক সার্কুলার রোডের একটি বাড়িতে ভাড়া থাকেন রওশন হাবিব। ছোট ছোট দুই ঘরে স্ত্রী-সন্তান ও বাবা-মাসহ সাতজনকে নিয়ে থাকেন তিনি। রওশন স্থানীয় একটি দোকানে ব্যবস্থাপকের কাজ করেন।
রওশনের মতো পুরান ঢাকার বেশির ভাগ বাসিন্দাই এমন ঘিঞ্জি পরিবেশে থাকতে বাধ্য হন। নিম্ন আয়ের মানুষের বসতি থেকে শুরু করে বহুতল ভবনগুলোর অবস্থাও খুব বেশি আলাদা নয়। চকবাজার ওয়াটার ওয়ার্কস রোডের দুই ধার ঘেঁষে সারি সারি বহুতল ভবন। ছোট ছোট প্লটের ওপর নির্মাণ করা ভবনগুলো মাঝে কোনো ফাঁকা জায়গা নেই বললেই চলে। ভবনগুলোর বেশির ভাগই পুরোনো, জরাজীর্ণ। ভবনে পর্যাপ্ত আলো–বাতাসসহ নানা নাগরিক সুবিধা থেকেও বঞ্চিত বাসিন্দারা।
স্থানীয় লোকজন বলছেন, ঢাকা শহরের গোড়াপত্তনের সঙ্গে এই এলাকা জড়িত। এখানে শতবর্ষী পুরোনো ভবনও আছে। ওই সময় পরিকল্পিত নগরায়ণের ধারণা অনুপস্থিত ছিল। তাই অবস্থা এমন হয়েছে। তাঁরা বলছেন, ঘিঞ্জি পরিবেশের কারণে তাঁরা ঘরে আলো-বাতাস পান না। শিশু-কিশোরদেরও বেশির ভাগ সময় ঘরেই কাটাতে হয়। কারণ, এলাকায় খেলাধুলার পর্যাপ্ত মাঠ-পার্ক নেই।
গতকাল সোমবার পুরান ঢাকার চকবাজারসহ অন্যান্য এলাকা সরেজমিনে ঘুরে এবং স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে চিত্র পাওয়া গেছে। এলাকাটি পরিকল্পিত উপায়ে গড়ার দায়িত্ব ছিল রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক)।
রাজউক বলছে, তাদের কার্যক্রম শুরুর অনেক আগেই পুরান ঢাকা অপরিকল্পিত উপায়ে গড়ে উঠেছে। এখন চকবাজারসহ পুরান ঢাকার অন্যান্য অংশ ঢেলে সাজাতে চায় সংস্থাটি। এ জন্য ‘ঢাকা নগর পুনঃ উন্নয়ন’ শীর্ষক একটি প্রকল্পের উদ্যোগ নিয়েছে সংস্থাটি। এর মধ্যেই এর প্রাক-উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব পাস হয়েছে। এতে অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এশিয়ান ইনফ্রাস্টাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি)।
রাজউক বলছে, পরিকল্পিত নগর গড়ার একটি কৌশল হচ্ছে ‘নগর পুনঃ উন্নয়ন’। ধারণাটি আমাদের দেশে নতুন। তবে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুরসহ উন্নত বিশ্বের নানা দেশে এটি বহুল প্রচলিত একটি কৌশল। এই কৌশলের মাধ্যমে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা নগর বা ছোট ছোট প্লটে বিভক্ত ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় নাগরিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে এলাকাটির সম্পূর্ণ সংস্কার বা আংশিক পুনর্নির্মাণ করা হয়। এ ক্ষেত্রে ছোট ছোট প্লট একত্র করে পুরো এলাকা নিয়ে পরিকল্পনা করা হয় এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী নতুন অবকাঠামো গড়া হয়।
রাজউক আরও বলছে, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একজন জমির মালিক স্বেচ্ছায় কিংবা কোনো সরকারি-বেসরকারি সংস্থার নেওয়া কোনো প্রকল্পের মাধ্যমে জমি একত্রিত করে প্রকল্প বাস্তবায়নে সম্মত হয়। এ ক্ষেত্রে জমির মালিকেরা প্রকল্প বাস্তবায়ন শেষে জমির হিস্যা অনুযায়ী আনুপাতিক হারে সুযোগ-সুবিধা পান।
রাজউকের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নগর পুনঃ উন্নয়ন প্রকল্পটি এলাকা হয়েছে এর মধ্যেই পুরান ঢাকার সাতটি এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে। রাজউকের পাশাপাশি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এই কাজে সমন্বয় করবে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনও এই প্রকল্পে আগ্রহ দেখিয়েছে।
এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি মোহাম্মদ ফজলে রেজা সুমন। তিনি বলেন, পুনঃ উন্নয়ন প্রকল্প ছাড়া পুরান ঢাকার বাসযোগ্যতা ও নাগরিক সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো কঠিন। এমন প্রকল্প বাস্তবায়ন না করতে পারলে ভবিষ্যতে বাস অযোগ্য শহরের তালিকায় ঢাকা শহর ‘চ্যাম্পিয়ন’ হবে।
এমনিতেই বাসযোগ্য শহরের তালিকায় তলানির দিক থেকে (বাস অযোগ্য) সপ্তম হয়েছে ঢাকা। ইকোনমিক ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) ২০২২ সালের সূচকে ১৭২টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৬৬তম।
পুরান ঢাকায় কেন এত সমস্যা
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অন্তর্ভুক্ত (ডিএসসিসি) পুরান ঢাকা। বিআইপি ২০২০ সালে করা এক সমীক্ষায় বলছে, নাগরিক সুবিধাসংক্রান্ত পরিকল্পনার মানদণ্ড অনুযায়ী, পুরান ঢাকার বর্তমান নাগরিক সুযোগ-সুবিধা অনুযায়ী সর্বোচ্চ দেড় লাখ মানুষ বসবাস করার কথা। কিন্তু এই এলাকায় প্রায় আট লাখ মানুষ বাস করে।
অতিরিক্ত মানুষের কারণে নাগরিক সেবাতেও টান পরে বলে মনে করেন নগর বিশেজ্ঞরা।
বিআইপির সভাপতি মোহাম্মদ ফজলে রেজা সুমন বলেন, ‘প্রত্যাশিত জনসংখ্যার চেয়ে কোনো এলাকায় বেশি মানুষের পড়লে স্বাভাবিকভাবেই ওই এলাকার শিক্ষা-স্বাস্থ্য, পরিবেশ, পানি-গ্যাসসহ সব ধরনের নাগরিক সুযোগ-সুবিধায় টান পড়ে।’
বিআইপির তথ্য অনুযায়ী, পুরান ঢাকার জনসংখ্যা অনুযায়ী ১২৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রয়োজন। কিন্তু ওই এলাকায় আছে ৩৮টি। উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রয়োজন ৬৪টি, আছে মাত্র ৪টি।
কলেজ প্রয়োজন ২৭টি আছে মাত্র ২টি। অন্যদিকে পুরান ঢাকায় ছোট-বড় মিলে ৫ থেকে ৬টি খেলার মাঠ আছে। এসব মাঠের মোট আয়তন সাড়ে ১১ একর। কিন্তু এই এলাকায় শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য অন্তত ১২৮টি মাঠের প্রয়োজন, যার ন্যূনতম মোট আয়তন হবে ১২৮ একর।
নগর পুনঃ উন্নয়ন প্রকল্পটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন বিআইপির সাধারণ সম্পাদক শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান। তিনি বলেন, এর বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জিং। কারণ, পুরান ঢাকায় একটি প্লটের মালিক অনেক ব্যক্তি, তাই জটিলতাও বেশি। প্রকল্প বাস্তবায়নে রাজউকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কতটা সততা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করবেন, তা নিয়েও সাধারণ মানুষের আস্থার সংকট আছে।
পুরান ঢাকায় রাস্তাগুলো সরু হওয়ার কারণে যানজট বেশি। গত সোমবার পুরান ঢাকার বংশাল, চকবাজার এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, এই এলাকার প্রায় প্রতিটি সড়কেই যানজট লেগে আছে। গলিতে পাশাপাশি দুটি রিকশা চলতেও কষ্ট হয়।
এই এলাকায় রিকশা চালান আবু হোসেন। তিনি বলেন, শুক্রবার ও অন্যান্য সরকারি ছুটির দিনে যানজট কম থাকে। কিন্তু অন্য সব দিন প্রচুর যানজট থাকে। বংশাল থেকে চকবাজার বা চানখাঁরপুল আসতেও মাঝেমধ্যে এক-দেড় ঘণ্টা সময় লাগে।
প্রক্রিয়াধীন ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার সমীক্ষা অনুযায়ী, পুরান ঢাকার অলি-গলি ও প্রশস্ত সড়কসহ মোট রাস্তা আছে প্রায় ১২৮ কিলোমিটার। এর মধ্যে অন্তত ৪৭ কিলোমিটার রাস্তার প্রস্থ ৫ ফুট থেকে ১০ ফুটের মধ্যে। ২০ ফুট থেকে ৩০ ফুট—এমন প্রশস্ত রাস্তা আছে ১২ দশমিক ৩৬ কিলোমিটার। আর ১০০ ফুটের বেশি প্রশস্ত রাস্তা আছে আধা কিলোমিটারেরও কম। সরু রাস্তার কারণে শুধু যানজট নয়, অগ্নিকাণ্ডের মতো দুর্ঘটনাতে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি পৌঁছাতে সমস্যা হয়।
রাজউকের উপ-নগর পরিকল্পনাবিদ আশিকুর রহমান প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, নগর পুনঃ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় থাকা এলাকার রাস্তা পুনর্নির্মাণ করা হবে। এর বাইরে বকশিবাজার-চকবাজার রোড ও নাজিমউদ্দিন রোড অন্তত ৬০ ফুট চওড়া করা উচিত।
তবে নগর পুনঃ উন্নয়ন প্রকল্পে জমি পেতে সমস্যা হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন নগর বিশেষজ্ঞরা। কারণ, এভাবে জমির মালিকানা ও ব্যবহার জটিল।
জটিল ভূমি ব্যবহার
গত সোমবার চকবাজার ও আশপাশের এলাকা ঘুরে দেখা গেছে এখানে আবাসিক এলাকা বলে কিছু নেই। বেশির ভাগ ভবনই বসবাসের পাশাপাশি ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহার করা হয়। কিছু কিছু বাসভবনে অবৈধভাবে রাসায়নিকের মজুত রাখার অভিযোগও পুরোনো।
এই কারণে ২০১০ সালের জুন মাসে পুরান ঢাকার নিমতলীতে এবং ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে চুড়িহাট্টার ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। প্রক্রিয়াধীন ড্যাপের তথ্য অনুযায়ী, পুরান ঢাকার মোট আয়তনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আবাসিক-বাণিজ্যিক ও শুধু বাণিজ্যিক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আবাসিক হিসেবে ব্যবহৃত হয় ৩৪ দশমিক ৫৪ একর, মিশ্র হিসেবে ২৩ দশমিক ৩৬, বাণিজ্যিক হিসেবে ৭ দশমিক ২৭ একর জমি।
এমন এলাকার উন্নয়নের জন্য পুনঃ উন্নয়ন ভালো বিকল্প হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল খান। তবে এ ক্ষেত্রে পুরান ঢাকার ঐতিহ্য রক্ষার প্রতি জোর দিয়েছেন তিনি। আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘এই প্রকল্পের মাধ্যমে পুরো এলাকা গুঁড়িয়ে সুউচ্চ ভবন তৈরি করা হলে সেটি পুরান ঢাকার নিজস্ব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সঙ্গে যাবে না। এ ক্ষেত্রে ‘কনজারভেটিভ সার্জারির (সীমিত আকারে সংস্কার করে সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি)’ মাধ্যমে পুরান ঢাকার সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে।’ এ জন্য এলাকা নির্ধারণ করাটা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
পুনঃ উন্নয়নে নির্ধারিত ৭ এলাকা
রাজউক বলছে, প্রাথমিকভাবে বংশালের ১২ দশমিক ৭১ একর, চকবাজারের এক দশমিক ৪৬ একর, ইসলামবাগের ১৪ দশমিক ৯৪ একর, মৌলভীবাজারের শূন্য দশমিক ৬ একর, লালবাগের প্রায় ৩৩ একর, কামরাঙ্গীরচরের ৩৩ দশমিক ৭৬৩ একর এবং হাজারীবাগ এলাকার প্রায় ১১১ দশমিক শূন্য ৩ একর জায়গা প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এসব এলাকার মধ্যে সবচেয়ে বেশি স্থাপনা আছে হাজারীবাগে।
রাজউকের জরিপ বলছে, হাজারীবাগে দুই হাজারের বেশি কাঠামো আছে। এলাকাটি মূলত ট্যানারি হিসেবে পরিচিত। পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণে এখান থেকে ট্যানারি শিল্প সাভারে স্থানান্তর করা হয়েছে।
রাজউক বলছে, পুনঃ উন্নয়নের ক্ষেত্রে হাজারীবাগ সম্ভাবনাময় এলাকা। এলাকাটি সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। পরিবহনও সহজলভ্য। বাণিজ্যিক অফিস এবং আবাসিক উন্নয়নের জন্য এই এলাকার চাহিদা রয়েছে।
তবে প্রকল্প বাস্তবায়নে পুরান ঢাকার ঐতিহ্য রক্ষায় জোর দিয়েছেন নগর পুনঃ উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক আশরাফুল ইসলাম। সিটি করপোরেশনের সঙ্গে সমন্বয় করে এ কাজ করা হবে বলেছেন তিনি। পাশাপাশি পুরান ঢাকা দুর্যোগ সহনীয় হিসেবে গড়া হবে এবং সেখানে খোলা জায়গা থাকবে।




















