গবেষণার প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ সংকটে ভুগছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং উদীয়মান গবেষকরা

শিক্ষা ও গবেষণায় দেশব্যাপী খ্যাতি রয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের। এখান থেকেই আলো ছড়িয়েছেন দেশের খ্যাতনামা নিউক্লিয়ার বিজ্ঞানী অধ্যাপক অরুণ কুমার বসাক, জীববিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. এম মনজুর হোসেন ও জার্মান-বাংলাদেশি কম্পিউটার বিজ্ঞানী বিভূতি রয়ের মতো বিশিষ্ট গবেষকরা। 

বর্তমানে গবেষণার প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ সংকটে ভুগছে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থী এবং উদীয়মান গবেষকরা। যে সকল যন্ত্রাংশ আছে সেগুলোর অধিকাংশই পড়ে আছে অকেজো অবস্থায়। ফলে কোনোমতে গবেষণা কার্যক্রম চালিয়ে নিতে অন্য বিশ্ববিদ্যালয় অথবা বিভিন্ন সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের দারস্থ হতে হচ্ছে তাদের। এতে বিশ্ববিদ্যালয়টির গবেষণা কার্যক্রম দারুণভাবে ব্যাহত হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রকৌশল, বিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান, কৃষি, মৎস্য বিজ্ঞান অনুষদসহ বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের প্রায় প্রতিটি বিভাগের ল্যাবগুলোতে অধিকাংশ যন্ত্রাংশ অকেজো হয়ে পড়ে আছে। আবার অধিকাংশ বিভাগের ল্যাবগুলোতে নেই প্রয়োজনীয় কেমিক্যাল এবং যন্ত্রপাতি। ফলে থিসিসসহ গবেষণাধর্মী সকল কাজে ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের।

জানতে চাইলে প্রাণিবিদ্যা বিভাগের এক শিক্ষার্থী বলেন, আমাদের বিভাগের ল্যাবে যে মাইক্রোটোম মেশিনগুলো আছে, সেগুলো ত্রুটিপূর্ণ হওয়ায় কাঙ্ক্ষিত রিবন পাওয়া যায় না। ওই সব রিবন মাইক্রোস্কোপে দেখার সময় টিস্যুর ক্রাইটেরিয়াগুলো বোঝা যায় না। দেখা যায় যে, রিবন এসেছে কিন্তু সেটা কুচকে গেছে। এছাড়া ল্যাবে যতগুলো মাইক্রোস্কোপ মেশিন আছে, প্রায় সবগুলোরই কার্যক্ষমতা কম। ফলে আমাদের অন্য বিভাগের ল্যাবগুলো থেকে সহযোগিতা নিতে হয়। এমনকি অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের বা সরকারি কোনো গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ল্যাবে গিয়েও কাজ করা লাগে। এতে করে আমাদের অর্থ এবং সময় দুটোরই অপচয় হয়।

এগ্রোনমি অ্যান্ড এগ্রিকালচারাল এক্সটেনশন বিভাগের শিক্ষার্থী আব্দুল মাজেদ তালুকদার বলেন, প্রতিটা শাখা বা বিষয়ের জন্য আলাদা আলাদা ল্যাব থাকার কথা থাকলেও আমাদের বিভাগে সেটা নেই। আমাদের শুধু প্যাথলজি ল্যাবটা আছে। এজন্য স্নাতকের শিক্ষার্থীরা পর্যাপ্তভাবে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন না। এছাড়া ল্যাবে প্রয়োজনীয় সব যন্ত্রপাতি নাই। আবার মৌলিক যে কয়টা যন্ত্র আছে, সেগুলোও অপর্যাপ্ত। এজন্য সিনিয়ররা কাজ করলে জুনিয়ররা কাজ করার সুযোগ পায়না।

ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী রবিউল ইসলাম বলেন, আমাদের বিভাগের ল্যাবের যন্ত্রাংশগুলো দিয়ে কোনোমতে একাডেমিক কাজগুলো চালিয়ে নেওয়া যায়। তবে ল্যাবে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটার না থাকায় একাডেমিক গবেষণার বাইরে ব্যক্তিগত কোনো গবেষণার কাজ করা সম্ভব হয় না।

বিশিষ্ট মৎস্য গবেষক ও ফিশারিজ বিভাগের অধ্যাপক ইয়ামিন হোসেন বলেন, যেখানে প্রতিনিয়ত গবেষণার ধরন পাল্টাচ্ছে, সেখানে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সকল বিভাগের ল্যাবগুলোর কোনোটাতে কেমিক্যাল সংকট আবার কোনোটাতে যন্ত্রাংশ থাকলেও সেগুলো সচল করার মতো ফান্ড নেই। এতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয়ের গবেষণা কার্যক্রম দারুণভাবে ব্যাহত হচ্ছে। আমরা শিক্ষার্থীদের উন্নত দেশের মতো গবেষণা সুবিধা দিতে পারছি না। এ অবস্থায় শিক্ষার্থীদের গবেষণামুখী করতে পর্যাপ্ত কেমিক্যাল সরবরাহ এবং যন্ত্রাংশ সংকট দূর করার পাশাপাশি অকেজো যন্ত্রাংশগুলো সচল রাখার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন। 

বিশিষ্ট গবেষক দ্য ওয়ার্ল্ড একাডেমি অব সায়েন্সের (টোয়াস) সদস্য এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সালেহ্ হাসান নকীব বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবগুলো চালাতে গেলে একটি রানিং কোস্ট এবং মেইনটেনেন্স কোস্ট লাগে। কিন্তু গবেষণা অনুদানে বা প্রকল্পে এই কোস্টগুলো উপেক্ষিত থেকে যায়। এর ফলে অনুদান বা প্রকল্পের টাকায় কেনা দামী যন্ত্রগুলো ভালোমত রক্ষণাবেক্ষণ করা যায় না।

তিনি বলেন, সব গবেষণার কার্যক্রম এখানেই হওয়ার কথা থাকলেও, প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের সংকটের ফলে শিক্ষার্থীদের ঢাকায় গিয়ে অথবা বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণাগারে গিয়ে গবেষণা কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে। সেখানেও যে তারা খুব ভালো সেবা পাচ্ছে, এমনটিও না। গবেষণার সকল ধরণের সংকটের বিষয়গুলোর প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নজর দেওয়া উচিত। 

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক বিষয়গুলো দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা উপউপাচার্য অধ্যাপক সুলতান-উল-ইসলাম বলেন, কোনো বিভাগের ল্যাবের বা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গবেষণাগারের যন্ত্রপাতি অকেজো থাকার বিষয়টি সংশ্লিষ্টরা আমাদের জানালে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারব। আর আমরা ইতোমধ্যে বাংলাদেশের বৃহত্তর গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘বিসিএসআইআর’-এর সাথে এমওইউ স্বাক্ষর করেছি। এখান থেকে আমরা সহজেই গবেষণা সহায়তা নিতে পারব।

তিনি বলেন, নতুন যন্ত্রপাতি কেনার বিষয়ে আমরা উদ্যোগ হাতে নিয়েছি। সরকারকেও আমরা এ বিষয়ে জানিয়েছি। আর দীর্ঘদিন ব্যবহার না করার কারণে অনেক যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে যায়। আমরা চাই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য কিনা যন্ত্রাংশগুলোর সর্বোচ্চ এবং পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার হোক। আমরা এমন ধরনের গবেষণা সরঞ্জাম কিনব যেগুলোতে শিক্ষার্থীরা প্রতিনিয়ত কাজ করতে পারবে।

spot_img
পূর্ববর্তী নিবন্ধজি-৭ এর সিদ্ধান্ত জানার পর হুমকি রাশিয়ার
পরবর্তী নিবন্ধঅপহরণ করে বিভিন্ন স্থানে ৪ দিন আটকে রেখে স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণ

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে