মহান মুক্তিযুদ্ধে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটসহ বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত রাজাকার বাহিনীর সহযোগী এক ব্যক্তিকে বীর মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগ উঠেছে। রাজশাহীর বাগমারার শ্রীপুর গ্রামের ইসমাইল হোসেন গাইন নামে স্বাধীনতা যুদ্ধে বিতর্কিত ভূমিকা পালনকারী ওই ব্যক্তি বীর মুক্তিযোদ্ধার তালিকাভুক্ত (বেসামরিক গেজেট নম্বর-২২৬৩) হওয়ায় স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা ও নির্যাতিত পরিবারগুলোর সদস্যদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ এবং অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, ইসমাইল গাইনের ছেলে জিল্লুর রহমান ক্ষমতাসীন দলের প্রভাব খাটিয়ে এমনটি করেছেন। ২০২১ সালের ১৫ জুন বাগমারা উপজেলা যাচাই-বাছাই কমিটি রাজাকার ইসমাইল হোসেন গাইনের নাম জামুকায় (জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল) প্রেরণ করে।
ইসমাইল গাইন বীর মুক্তিযোদ্ধার তালিকাভুক্ত হওয়ার সময় জিল্লুর রহমান এমপি এনামুলের মিডিয়া কর্মকর্তা ছিলেন। তবে বিভিন্ন অনিয়ম এবং দুর্নীতির কারণে জিল্লুরকে তার দায়িত্ব থেকে সম্প্রতি অব্যাহতি দিয়েছেন এমপি এনামুল।
এদিকে ইসমাইল হোসেন গাইন বীর মুক্তিযোদ্ধার তালিকাভুক্ত হওয়ার ফলে নিজেদের সম্মানহানি ঘটেছে বলে মনে করছেন স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধারা। এ ঘটনায় মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী রাজাকার বাহিনীর অন্যতম সহযোগী ইসমাইল গাইনকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার জন্য স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা ময়েজ উদ্দিন বাগমারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই উপজেলা কমিটির সদস্য সচিব এবং জামুকার মহাপরিচালক বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। লিখিত অভিযোগে বাগমারার শতাধিক স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা এবং এলাকাবাসী স্বাক্ষর করেছেন।
লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, বাগমারার শ্রীপুর গ্রামের মৃত মকিম উদ্দিন গাইনের ছেলে ইসমাইল হোসেন গাইন ছিলেন বাগমারায় রাজাকার বাহিনীর প্রধান ইব্রাহিম হোসেনের অন্যতম সহযোগী। বাগমারায় মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ছিলেন ইসমাইল হোসেন মৃধা। ওই সময়ে স্থানীয় রাজাকার বাহিনীর প্রধান ইব্রাহিম হোসেনের নেতৃত্বে ইসমাইল গাইন, ইয়াসিন এবং ইসাহাকসহ ওই এলাকার রাজাকাররা মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেন মৃধার বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে এবং ব্যাপক লুটপাট চালায়।
এছাড়া বীর মুক্তিযোদ্ধা ময়েজ উদ্দিন, বীর মুক্তিযোদ্ধা মছির উদ্দিন গাইন, স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা শমসের উদ্দিন, ইউসুফ বকসের বাড়িতেও অগ্নিসংযোগ এবং লুটপাট চালায়। এ কারণে লিখিত অভিযোগে রাজাকার বাহিনীর অন্যতম সহযোগী ইসমসাইল হোসেন গাইনকে মুক্তিযোদ্ধার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার জোর দাবি জানানো হয়েছে।
লিখিত অভিযোগকারী বীর মুক্তিযোদ্ধা ময়েজ উদ্দিন বলেন, ইসমাইল হোসেন গাইন মহান মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাসহ স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করে এবং লুটপাট চালিয়েছেন। স্বাধীনতা অর্জনের দীর্ঘ ৫০ বছর পর তিনি কীভাবে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হলেন- এটি আমাদের বোধগম্য হচ্ছে না। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত মানহানিকর। তাকে যদি মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দেওয়া হয়, তাহলে এটি প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক হবে।
এদিকে বাগমারার মুক্তিযোদ্ধাদের একটি সূত্র জানায়, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং জামুকার মহাপরিচালক বরাবর লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পর স্থানীয় নির্যাতিত ও ক্ষতিগ্রস্ত মুক্তিযোদ্ধা, তাদের পরিবারের সদস্য এবং রাজাকার বাহিনীর সদস্য ইসমাইল হোসেন গাইনকে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী ঢাকায় ডাকেন। এরপর মন্ত্রী উভয়পক্ষের শুনানি গ্রহণ করেন। শুনানির সময় ইসমাইল হোসেন গাইনের স্বাধীনতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়। এরপর বিষয়টি তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য বাগমারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
তৎকালীন ইউএনও ফারুক সুফিয়ান তদন্ত শুরু করেন। তিনি যুদ্ধকালীন কমান্ডার আলী খাজা এম এম মজিদসহ এলাকার মুক্তিযোদ্ধা ও নির্যাতিত পরিবারের সদস্যদের লিখিত জবানবন্দি গ্রহণ করেন। নির্যাতিতরা ইসমাইল হোসেন গাইনের স্বাধীনতাবিরোধী কর্মকাণ্ড সম্পর্কে লিখিতভাবে জানান।
এরপর ইউএনও ফারুক সুফিয়ান নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলায় বদলি হয়ে যান। তিনি বদলি হওয়ার পর তদন্তের গতি থেমে যায়। নতুন ইউএনও সাইদা খানম যোগদান করেন। তবে তিনি এখনো তদন্ত শুরু করেননি।
স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের অভিযোগ, ইউএনও দপ্তরকে ‘ম্যানেজ’ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ইসমাইল গাইনের ছেলে জিল্লুর রহমান প্রভাব খাটিয়ে প্রতিবেদনটি নিজেদের অনুকূলে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে বাগমারার ইউএনও সাইদা খানম বলেন, তদন্তে গতি নেই এমন অভিযোগ সঠিক না। আমার আগের কর্মকর্তা বিষয়টি তদন্ত করছিলেন। আমি নতুন যোগদান করেছি। অচিরেই তদন্ত শুরু করা হবে।
মহান মুক্তিযুদ্ধে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের অভিযোগ সম্পর্কে ইসমাইল হোসেন গাইনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তাকে পাওয়া যায়নি। তবে এ ব্যাপারে ইসমাইল হোসেন গাইনের ছেলে জিল্লুর রহমান বলেন, বাগমারার ইউএনও আমাকে চেনেন না। তাই উনাকে প্রভাবিত করে তদন্ত প্রতিবেদন আমাদের অনুকূলে নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগটি ভিত্তিহীন। আর মুক্তিযুদ্ধকালীন আমার বাবার বিরুদ্ধে বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ এবং লুটপাটের যে অভিযোগ আনা হচ্ছে, সেটিও বানোয়াট। একটি চক্র আমার বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে ষড়যন্ত্র করে আমি এবং আমার পরিবারের ক্ষতি করার চেষ্টা করছে।
তবে বাগমারায় মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ইসমাইল হোসেন মৃধার ছেলে শ্রীপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা মকবুল হোসেন মৃধা বলেন, আমাদের পরিবারের সদস্যরা মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় বাংলা বাহিনীর ক্যাডাররা আমাকে গুলিবিদ্ধ করে। আমরা নির্যাতিত পরিবার। কিন্তু এখন দেখছি, রাজাকার ইসমাইল গাইনের নাম গেজেটে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। আমি এর তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি। অবিলম্বে গেজেট থেকে তার নাম বাতিলের দাবি জানাচ্ছি। অন্যথায় আমরা আইনের আশ্রয় নিতে বাধ্য হব।




















